রাজধানীর বিভিন্ন ক্যাসিনোতে একের পর এক চলছে অভিযান। আটক হচ্ছেন সরকারদলীয় যুব সংগঠন যুবলীগের শীর্ষ নেতারা। উদ্ধার হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু বাংলাদেশে ক্যাসিনোর বিস্তারে যাদের মূল ভূমিকা তারাই থাকছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

অভিযোগ রয়েছে রাজধানীর ভেতর ক্যাসিনোতে শেল্টার দিয়েছেন যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট। তার রাজনৈতিক শেল্টারেই নেপালিরা একের পর এক ক্যাসিনো খুলে বসে নগরীতে। বিভিন্ন ছোট-বড় ক্যাসিনোতে রয়েছে তাদের অংশীদারিত্ব। এর মাধ্যমে ক্যাসিনোতে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে নেপাল কিংবা অন্য কোনো দেশে। শুরু থেকেই সম্রাটের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তিনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

রাজধানীর ক্লাবপাড়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ক্যাসিনো ও মাদক সম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রায় পঞ্চাশ গডফাদার।এদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও নেপালের মতো রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাবে জুয়া আর মাদকের অবৈধ ক্যাসিনো বসিয়ে তারা হয়ে ওঠেছেন বিপুল পরিমান বিত্ত-বৈভবের মালিক। গ্রেফতার হওয়া যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও এস এম গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীম, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি শফিকুল ইসলাম ফিরোজ পৃথক মামলায় গোয়েন্দা পুলিশের রিমান্ডে রয়েছেন।মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জুয়ার নিয়ন্ত্রক এক সময়ের বিএনপি নেতা লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। তিনি এখন বিসিবি পরিচালক।গতকাল তেজগাঁওয়ের মনিপুরী পাড়ার নিজ বাসা থেকে লোকমান হোসেন ভূঁইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে র‍্যাব।

এ ছাড়াও পুলিশের ধরার ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে মতিঝিলে মোট ছয়টি ক্লাবের মধ্যে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সভাপতি স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাউছার, আরামবাগ ও দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ৯ নম্ব্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে মমিনুল হক সাঈদ, ভিক্টোরিয়া ক্লাবের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট সহ বেশ কয়েকজন। 

ক্যাসিনো থেকে প্রাপ্ত মোটা অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন কৌশলে পাচার করে দিয়েছেন বিদেশে।ঢাকার ক্যাসিনোগুলোর আয়ের অর্থ তিনভাবে পাচার হচ্ছিল বিদেশে। প্রথমত, ক্যাসিনোগুলোয় কর্মরত বিদেশি নাগরিকরা তাঁদের বেতন ও অংশীদারি থেকে পাওয়া অর্থ নিজ দেশে পাচার করতেন। দ্বিতীয়ত, ক্যাসিনোগুলোর একাধিক মালিক নিয়মিত সিঙ্গাপুর, দুবাই, ব্যাংককে গিয়ে জুয়া খেলে ওড়াতেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। তৃতীয়ত, ক্যাসিনোর আয়ের টাকা পাচার করা হতো বিদেশে অবস্থানকারী সরকারের তালিকাভুক্ত একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর কাছে। 

এসব তথ্য পাওয়া গেছে ঢাকার ক্যাসিনো মালিকদের রাজনৈতিক সহযোগীদের কাছ থেকে।গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক এনু ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূপন ভুইয়াকে পুলিশ খুঁজছে। এই দুজনও দেশ ত্যাগ করেছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছেন। শ্রমিক লীগের নেতা ক্যাসিনো ব্যবসায় অভিযুক্ত কাজী জাকারিয়াকে পুলিশ খুঁজছে। তিনি উত্তরা পশ্চিম থানা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক। যদিও এখন পর্যন্ত তার অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন এবং দেশেই অবস্থান করছেন। 

যুবলীগের আইসিটি বিষয়ক সম্পাদক এবং টেন্ডার বাণিজ্যের অন্যতম হোতা মো. শফিকুল ইসলামকেও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা খুঁজছে। শফিকুল ইসলামও বিদেশ যেতে পারেননি বলে মনে করছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। 

এই শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর থেকে আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতা নিঁখোজ রয়েছেন। তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। এদের কাউকে কাউকে র‌্যাব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হণ্যে হয়ে খুঁজছে। কিন্তু তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোন খোঁজ খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

 আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলেছেন, শতাধিক নেতার মধ্যে অন্তত অনেকেই বিদেশ চলে গেছেন বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। বাকিরা দেশেই কোথাও ঘাপটি মেরে আছেন। তারা যেন বিদেশ যেতে না পারেন সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মতিঝিলের ক্লাবগুলোর নিয়ন্ত্রণ যায় যুবলীগের কয়েকজন নেতার হাতে, যারা পরবর্তী সময়ে নিজেদের মাফিয়া হিসেবে তৈরি করেন। 

জানা গেছে, এক প্রভাবশালী যুবনেতার নিয়ন্ত্রণে চলা ক্যাসিনো থেকে শুধু চাঁদা তোলার কাজ করে একসময় কাকরাইলের বিপাশা হোটেলের বয়ের কাজ করা জাকির হোসেন ও গুলিস্তানের হকার আরমান এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। দুটি ক্যাসিনোর মালিকানাও রয়েছে ।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও জুয়াড়িদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকায় ক্যাসিনোর বিস্তার ঘটান নেপালি নাগরিক দীনেশ ও রাজকুমার। প্রভাবশালী এক যুবলীগ নেতার তত্ত্বাবধানে এরা একের পর এক ক্যাসিনো খুলে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে দেশে পাচার করেন।

২০১৫ সালে ভিক্টোরিয়া ক্লাবে ক্যাসিনো খোলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে অবৈধ এ ব্যবসা শুরু করেন নেপালের ক্যাসিনো ব্যবসায়ী দীনেশ ও রাজকুমার। যুবলীগ নেতা আরমান ও খোরশেদ প্রতিদিন গিয়ে চাঁদার টাকা নিয়ে আসেন সেখান থেকে। 

ঢাকার নামকরা জুয়াড়ি শফিকুল আলম সেন্টু ২০১৬ সালে কলাবাগান ক্লাবে ক্যাসিনো খোলেন নেপালি নাগরিক দীনেশ, রাজকুমার ও অজয় পাকরালের সঙ্গে। এখান থেকে প্রতিদিন ২ লাখ টাকা করে চাঁদা নিতেন এক প্রভাবশালী যুবনেতা। 

দীনেশ ও রাজকুমারের অংশীদারিত্বে উত্তরায় এপিবিএন অফিসের উল্টো পাশে একটি ভবন ভাড়া করে চালু করা হয় আরেকটি ক্যাসিনো। তাদের পার্টনার হন তছলিম নামের এক স্থানীয় যুবলীগ নেতা। এরপর ওই এলাকায় প্রভাবশারী যুবনেতার তত্ত্বাবধানে স্থানীয় যুবলীগ নেতাদের মাধ্যমে আরও কয়েকটি ক্যাসিনো গড়ে তোলেন তারা, যার প্রতিটি থেকে দিনে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন আরমান।

মালিবাগ-মৌচাক প্রধান সড়কের পাশের একটি ভবনে সৈনিক ক্লাব। আর এটি নির্ধারিত টাকায় ভাড়া নিয়ে ক্যাসিনো খোলেন যুবলীগ নেতা জসিম উদ্দিন ও এ টি এম গোলাম কিবরিয়া। এই ক্লাব থেকে প্রতিদিন ৪ লাখ টাকা চাঁদা পান ওই যুবনেতা।

বনানীর আহমেদ টাওয়ারের ২২ তলায় ঢাকা গোল্ডেন ক্লাব খোলেন চাঁদপুরের ব্যবসায়ী আওয়াল পাটোয়ারী ও আবুল কাশেম। ওই সময় যুবলীগ নেতা আরমান জোর করে ক্লাবটির মালিকানায় ঢুকে পড়েন। এখান থেকেও ক্যাসিনো গড়ে ওই যুবনেতার জন্য প্রতিদিন ৪ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন আরমান।

ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনো খোলেন নেপালি নাগরিক হিলমি। তার এ-দেশীয় অংশীদার মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মোবাশ্বের। মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাওসারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চলে এই ক্যাসিনো। এখান থেকে প্রতিদিন এক যুবলীগ নেতাকে দিতে হয় ৫ লাখ টাকা।

মহিউদ্দীন মহির ইশারা ছাড়া ঐহিত্যবাহী ক্রীড়া সংগঠন ব্রাদার্স ইউনিয়নের পাতাও নড়ে না বলে স্থানীয়দের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে। সন্ধ্যার পরই এই ক্লাবে চলে জুয়া আর হাউজি।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ দক্ষিণের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদের তত্ত্বাবধানে একসময়ের ফুটপাত হকার মতিঝিল থানা যুবলীগের বর্তমান নেতা জামালের মালিকানায় ক্যাসিনো খোলা হয় আরামবাগ ক্লাবে। মমিনুল হক সাঈদ তার অলিখিত অংশীদার। আছে নেপালি অংশীদারও। এই ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন তিন লাখ টাকা দেওয়া হয় দক্ষিণ যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতাকে।

অ্যাজাক্স ক্লাবটি এলিফ্যান্ট রোডের অ্যাজাক্স ক্লাব চালু হয় যুবলীগ নেতা আরমান, তছলিম ও খোরশেদের তত্ত্বাবধানে। নেপালি নাগরিক ছোট রাজকুমারকে দিয়ে ক্যাসিনোটি চালু করেন তারা। এই ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন দক্ষিণের যুবলীগের পরাক্রমশালী নেতার পকেটে যেত ৩ লাখ টাকা।

জানা গেছে, গুলশান এলাকায় একাধিক বার ও ক্লাবের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন কালা নাসিরের বন্ধু তালাল রিজভী নামের একজন। জাতীয় পার্টির একজন প্রভাবশালী নেতার প্রত্যক্ষ মদদে তালাল রিজভীর ইশারায় ওই ক্লাবগুলোতে কয়েক দিন আগ পর্যন্ত চলত নানা ধরনের অপকর্ম। অন্যদিকে ২০ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ নেতা কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দীন রতন তার এলাকার বিভিন্ন পেশাজীবী ও স্পোর্টস ক্লাবে হাউজি ও জুয়ার মদদদাতা।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ক্লাবে দীর্ঘকাল ধরেই জুয়ার চর্চা ছিল। কিন্তু অনুমোদনহীন ক্যাসিনো কীভাবে হলো তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। 

জানা যায়, ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশে অবৈধ এ ব্যবসা শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া ক্লাবে। যার কর্ণধার নেপালের ক্যাসিনো ব্যবসায়ী দীনেশ মানালী এবং রাজকুমার। এ ছাড়া তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বিনোদ মানালী। নেপাল ও ভারতের গোয়ায় তাদের মালিকানায় ক্যাসিনো ব্যবসা রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৪ই সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহীর কমিটির বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস এবং ক্যাডার রাজনীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ওইদিনই তিনি শুদ্ধি অভিযানের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের অপসারণের মাধ্যমে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছিল।