বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের সর্বশেষ কেন্দ্রীয় সম্মেলনের পর কেটে গেছে ৭ বছর। এরপর আর সম্মেলন হয়নি বলে নতুন নেতৃত্বের সুযোগ মিলছে না দলটিতে। শুধু কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্ব নয় নাজুক অবস্থায় রয়েছে সারাদেশের যুবলীগের কমিটি গুলোতে। দীর্ঘদিন নেতৃত্বে পরিবর্তন না আসায় নেতৃত্ব নিয়েও দ্বন্দ্ব বেড়েছে বলে মনে করছেন নেতা কর্মীরা। দেশের বিভিন্ন জেলা গুলোতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে ব্যর্থ যুবলীগ।

রাজবাড়ী জেলা যুবলীগের কমিটি ১৩ বছরেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। কেন্দ্রের সঙ্গে জেলার প্রভাবশালী নেতাদের সমন্বয়ের অভাবে সম্মেলন হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে নেতা কর্মীদের।

জানা যায়, জেলা যুবলীগের সবশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৭ সালে। সম্মেলনে আলী হোসেন পনীকে সভাপতি ও প্রসিত চৌধুরী বিশুকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ২০০৪ সালে হরতাল পালনকালে প্রসিত চৌধুরী মারা যান। এরপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়।

সিলেটে নতুন নেতৃত্বের ধারা বিকশিত করতে ১৬ বছর পর হয়েছে সিলেট জেলা যুবলীগের সম্মেলন। একই সাথে ৫ বছর পর সম্মেলনের মাধ্যমে হচ্ছে মহানগর শাখারও। তবে সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি কতদিনে হবে এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে এখনও নেতাকর্মীদের মধ্যে।

জানা গেছে, সর্বশেষ ২০০৩ সালে জেলা যুবলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে সময় লাগে প্রায় ৩ বছর।

খুলনা জেলা যুবলীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালের ২৫ মে। সম্মেলনে কামরুজ্জামান জামাল সভাপতি ও আক্তারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করে ৭১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ২০০৬ সালে এই কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও গত আট বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি।

যশোর জেলা যুবলীগের কমিটি তিন বছরের জন্য গঠিত হয়ে ১৬ বছর পার করেছে। এ কমিটির অধিকাংশ নেতাকর্মী এখন নিস্ক্রিয়। কমিটি না হওয়ায় পদপ্রত্যাশী ও সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

নাটোর জেলা যুবলীগের এক বছর দুই বছর নয়, দীর্ঘ উনিশ বছর নতুন নেতৃত্বের দেখা নেই। উনিশ বছর আগে দুই বছরের জন্য জেলা যুবলীগের কমিটি হয়েছিল। মেয়াদ শেষের উনিশ বছরেও নতুন নেতৃত্ব হাল ধরতে পারেনি জেলা যুবলীগের। ফলে নাটোরে ঝিমিয়ে পড়েছে যুবলীগের কর্মকান্ড। ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে প্রায় চার বছর ধরে চলছে জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক কর্মসূচি ।

এ দিকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন নিয়ে সংগঠনটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের বক্তব্যে দলটির সম্মেলনে কোন অবহেলাও প্রকাশ পাচ্ছে না। সম্মেলন করার মতো সার্বিক প্রস্তুতিও তাদের রয়েছে বলে তারা মনে করছে।

তারা বলছেন, সম্মেলন করার জন্য যুবলীগের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। সংগঠনটির সরাসরি অভিভাবক আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যখন বলবেন তখনই সম্মেলন হবে। যুবলীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১২ সালের ১৪ জুলাই। সে হিসেবে ২০১৫ সালের জুলাইয়ে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এরপরেও কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিন বছর।

এ দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশন শেষে দেশে ফিরেই সম্প্রতি নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে ওঠা যুবলীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেটা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগেই যুবলীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর দলটির ২১তম জাতীয় সম্মেলনের ঘোষণা রয়েছে।

গতকাল ১ অক্টোবর সকালে গণভবনে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সাথে সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনায় বসেন শেখ হাসিনা। এ সময় যুবলীগের ব্যাপারে এমন ইঙ্গিত দেন বলেই বৈঠকসূত্র জানায়। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে দলীয় নীতি-নির্ধারণী ফোরামে এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করে সহযোগী সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সম্মেলনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে। নভেম্বরের শেষ নাগাদ কাউন্সিল হতে পারে বলেই জানিয়েছে সূত্রটি।

তবে শোনা যাচ্ছে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে মূল দলের জেলা, মহানগর, উপজেলার সম্মেলন শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলনও দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে, সংগঠনটির অভ্যন্তরে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি আরমান হোসেন, বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া কি করে ফ্রিডম পার্টি থেকে যুবলীগে এলো, গ্রেফতার হওয়া অপর যুবলীগ নেতা জি কে শামীম কোন পথে যুবদল থেকে যুবলীগে পদ পেলো এসব নিয়ে চলছে নানা কানাঘুষা।

এদিকে সম্মেলন আয়োজনের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না যুবলীগের নতুন নেতৃত্বপ্রত্যাশীরা। তারা রীতিমতো হতাশ। ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে বিদায় নেওয়া অনেক নেতাই যুবলীগের নেতৃত্বপ্রাপ্তির প্রত্যাশা করছেন; কিন্তু সম্মেলন না হওয়ায় তাদের সে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।

সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের চারটি সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেন। ঘোষিত সংগঠনগুলোর সম্মেলন ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পাশাপাশি এ সময় তিনি যুবলীগসহ আরও দুই সহযোগী সংগঠন- স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও কৃষক লীগের সম্মেলনের তারিখ শিগগিরই ঘোষণা করার কথা বলেছিলেন; কিন্তু সেই তারিখ আর ঘোষণা হয়নি।

দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, যুবলীগ সব সময় আওয়ামী লীগের ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করেছে, রাজপথে সক্রিয় থেকেছে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রতিদিনই কর্মসূচি নিয়ে মাঠে ছিল। প্রায়ই বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা, কর্মিসভা ও প্রকাশনা উৎসব করছে সংগঠনটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রলীগের বিগত দুই কমিটি মাহমুদ হাসান রিপন ও মাহফুজুল হায়দার রোটন এবং বদিউজ্জামান সোহাগ ও সিদ্দিকী নাজমুল আলমের কমিটিতে যারা ছিলেন; তাদের অনেকেই যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পদপ্রত্যাশী।

প্রসঙ্গত,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা করা হয়। সংক্ষেপে যুবলীগ নামেই সংগঠনটি পরিচিত। এটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুব অঙ্গসংগঠন। এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামে যুবলীগের নেতাকর্মীদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারের আন্দোলনে শহীদ হওয়া নূর হোসেন ছিলেন যুবলীগেরই সক্রিয় কর্মী।